রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আ ন ম আয়াসসহ চারজনকে গত শনিবার (১০ অক্টোবর) আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ। পরদিন রোববার তাদের আদালতে হাজির করে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং রিমান্ডের আবেদন করা হয়।
এ ঘটনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলামের বক্তব্যের ভিত্তিতে একাধিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে মামলাটিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল গাফফার হিমেল বলেন, মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে দণ্ডবিধির ১২০বি, ১৫৩এ ও ২৯৫এ ধারায়।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার দেওয়া তথ্য মতে এসব ধারা রাষ্ট্রদ্রোহ-সংক্রান্ত দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারা নয়। তা সত্বেও একাধিক গণমাধ্যমে এটিকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ফ্যাক্টচেক ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে একাধিক গণমাধ্যমের শিরোনাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে আয়াসসহ চারজনকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ গ্রেপ্তার দেখানোর খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা দেয়।
মামলাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হিসেবে উপস্থাপন করায় অনেকেই পুলিশের ভূমিকা ও অভিযোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
পিনাকী ভট্টাচার্য তাঁর ফেসবুক পেজে লেখেন, “আয়াসকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হইসে। রঠা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) তাইলে বাঙ্গুদের রাষ্ট্র!!??”
সাংবাদিক ও লেখক মাহবুব মোর্শেদ গ্রাফিতি নষ্ট করার অভিযোগে অভিযুক্তদের শাস্তি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। তবে এ ঘটনায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনার সমালোচনা করে তিনি লেখেন, “.এ কারণে তাদের শাস্তি হওয়া দরকার। তবে এ কারণে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা বেশি হয়ে যায়।”
মীর জাহান নামে আরেকজন লেখেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি দিলে ধর্মীয় সংঘাত হয় কীভাবে?আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এতে রাষ্ট্রদ্রোহ হলো কীভাবে? রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক, নাকি তাঁর ছবিতে কালি দেওয়াই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা?”
সংবাদমাধ্যমকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ তথ্য দিয়েছিলেন ডিসি রমনা
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, শুরুতে তিনিই গণমাধ্যমকে ঘটনাটিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
মামলার নথিতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও কেন গণমাধ্যমকে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছিল, জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেন, দণ্ডবিধির ১২০বি ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহের অংশ হিসেবে আসে।
তিনি বলেন, “১২০-এর খ তো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, ওইটা রাষ্ট্রদ্রোহেরই একটা অংশ হিসেবে আসে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য: ‘এটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা না’
রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম দণ্ডবিধির ১২০বি ধারাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করলেও তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি।
তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ নয়।
গণমাধ্যমে প্রচারিত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের সঙ্গে মামলার নথিতে থাকা দণ্ডবিধির ১২০বি, ১৫৩এ ও ২৯৫এ ধারার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা না।”
প্রথম আলোর সংশোধনীতে মামলাটিকে ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের’ মামলা হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, হ্যা এটা ‘অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের’ মামলা।
‘মামলায় রাষ্ট্রদ্রোহের ধারা নেই’ বলছেন আইনজীবি
মামলার নথিতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ না থাকা এবং পুলিশের দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া।
মামলাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে প্রচার করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহের নির্দিষ্ট ধারা ১২৪এ। গণমাধ্যমে মামলাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়টিকেও তিনি সমস্যাজনক বলে উল্লেখ করেন।
Leave a Reply