ব্যাংকে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ের আমানত বাড়ছে। ছোট ছোট সঞ্চয় জমে গত জুন শেষে এ ধরনের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৯৩ শতাংশ আমানতই রয়েছে বিভিন্ন অঙ্কের লাখ টাকার নিচে ও লাখ টাকার স্তরের হিসাবে। বিপরীতে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে, এমন হিসাবের সংখ্যা মাত্র ৪০ হাজার ৭০১টি। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের সঞ্চয়েই ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে ব্যাংকে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ের আমানত বাড়লেও জাতীয় সঞ্চয়ের চিত্র ভিন্ন। গত তিন অর্থবছর ধরে জিডিপির তুলনায় জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমছে। অন্যদিকে বাড়ছে ভোগব্যয়ের অংশ। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমছে। এমনকি অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে আগের জমানো অর্থও খরচ করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু ব্যাংকে আমানত বাড়লেই জাতীয় সঞ্চয়ের ভিত্তি শক্তিশালী হয় না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি খাতের বাজেট ঘাটতি এবং সঞ্চয়বান্ধব আর্থিক পণ্যের অভাব জাতীয় সঞ্চয়ের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগেও। তাদের মতে, সঞ্চয় বাড়াতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সঞ্চয়ের সক্ষমতা ও আগ্রহ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সঞ্চিত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের বড় অংশ আসে পরিবারের ছোট ছোট সঞ্চয় থেকে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে আমানত বাড়ার ক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফার অর্থও যুক্ত হয়। ফলে আমানতের প্রবৃদ্ধির পুরোটাই নতুন করে জমা করা অর্থ নয়।
ড. তৌফিক বলেন, দেশে সঞ্চয় বাড়াতে মানুষের অভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে। আয় থেকে খরচ করার পর যা থাকে, তা সঞ্চয় না করে আয় পাওয়ার পরই একটি অংশ সঞ্চয়ের জন্য নির্ধারণ করা উচিত। পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজন ও সঞ্চয়ের লক্ষ্য অনুযায়ী সঞ্চয়পণ্য তৈরি করতে হবে। দেশের প্রচলিত আর্থিক পণ্যগুলো যথেষ্ট সঞ্চয়কারীবান্ধব নয়। এ ছাড়া স্কুলপর্যায় থেকেই শিশুদের সঞ্চয় ও অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শুধু লেনদেন নয়, ছোটবেলা থেকে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ছোট অঙ্কের হিসাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যক্তি ও পরিবারের নামে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৭০টি। এর মধ্যে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৯১ হাজার ৭৯৪টি হিসাবে। অর্থাৎ মোট হিসাবের প্রায় ৯৩ শতাংশই ছোট অঙ্কের সঞ্চয়ের।
অন্যদিকে ২ লাখ টাকার বেশি থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ১ কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০৭টি হিসাবে। ২৫ লাখ টাকার বেশি থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ৪ লাখ ৬৬ হাজার ১১৮টি হিসাবে। আর ৫০ লাখ টাকার বেশি থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৫০টি হিসাবে।
অর্থাৎ ব্যাংক হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে ছোট আমানতকারীদের আধিক্য অনেক বেশি। কারও হিসাবে এক হাজার টাকা, কারও হিসাবে দশ হাজার, আবার কারও হিসাবে জমা রয়েছে এক-দুই লাখ টাকা। এসব হিসাবের সম্মিলিত সংখ্যা ব্যাংক খাতে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের বিস্তৃত ভিত্তির ইঙ্গিত দেয়।
তবে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা আর প্রকৃত আমানতকারীর সংখ্যা এক নয়। একই ব্যক্তি একাধিক ব্যাংকে কিংবা একই ব্যাংকে একাধিক হিসাব খুলতে পারেন। ফলে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ১৬ কোটির বেশি হলেও একে ১৬ কোটি স্বতন্ত্র আমানতকারী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
লাখ টাকার বিভিন্ন স্তরে জমা আমানতের বড় অংশ : শুধু হিসাবের সংখ্যায় নয়, আমানতের পরিমাণের দিক থেকেও ছোট ও মাঝারি অঙ্কের সঞ্চয়ের গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যক্তি ও পরিবারের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে এ পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে এ ধরনের আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বা প্রায় ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এর মধ্যে মোট আমানতের ১৩ শতাংশ রয়েছে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকা হিসাবে। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২ লাখ টাকার বেশি থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে মোট আমানতের ৫৬ শতাংশ বা ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২৫ লাখ টাকার বেশি থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হিসাবে রয়েছে ১৩ শতাংশ বা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আর ৫০ লাখ টাকার বেশি থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত হিসাবে রয়েছে ১১ শতাংশ বা ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, ব্যাংকে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ের আমানত বাড়ার অন্যতম কারণ প্রবাসী আয় বৃদ্ধি। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি ও পরিবারের হাতে অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। এর একটি অংশ ব্যাংকে সঞ্চয় হিসেবে জমা হচ্ছে। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ না থাকলে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে সঞ্চয়ের পরিমাণ আরও বাড়ত।
মাজেদুল হক আরও বলেন, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সঞ্চয় ধরে রাখতে এবং বাড়াতে সরকারকে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, যাতে মানুষ প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পরও সঞ্চয়ের সুযোগ পায়। একই সঙ্গে ব্যাংকে জমা হওয়া এসব অর্থ যেন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এতে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়বে, যার সুফল সাধারণ মানুষও পাবে।
কোটি টাকার হিসাবে আমানত ৭ শতাংশ : ছোট আমানতকারীদের আধিক্যের পাশাপাশি বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৩৭ হাজার ৩৬টি। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১টিতে। অর্থাৎ এক বছরে এ ধরনের হিসাব বেড়েছে ৩ হাজার ৬৬৫টি।
এর মধ্যে ১ কোটি টাকার বেশি থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৯৩২টি থেকে বেড়ে ৪০ হাজার ৫৯৯টিতে দাঁড়িয়েছে। ২৫ কোটি টাকার বেশি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা হিসাব ৭৮টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৭টি। তবে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ২৬টি থেকে কমে ১৫টিতে নেমেছে।
সব মিলিয়ে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের নিট সংখ্যা বেড়েছে ৩ হাজার ৬৬৫টি। অন্যদিকে গত জুন শেষে এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা ব্যক্তিপর্যায়ের মোট আমানতের মাত্র ৭ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির চাপে বেড়েছে ভোগব্যয়, কমছে জাতীয় সঞ্চয় : ব্যাংকে ব্যক্তিপর্যায়ের আমানত বাড়লেও জাতীয় সঞ্চয়ের চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন প্রবণতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছর ধরে জিডিপির তুলনায় জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ ছিল জাতীয় সঞ্চয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে। একই সময়ে জিডিপির তুলনায় মোট ভোগব্যয়ের অংশ ৭৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয়ের বড় অংশই সঞ্চয়ের বদলে ভোগব্যয়ে চলে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকে ব্যক্তিপর্যায়ের আমানত বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ার বিষয়টি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতেও আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে সঞ্চয়ের জন্য আগের তুলনায় কম অর্থ থাকছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক বলেন, দেশের ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা হওয়া আমানতের বড় অংশ আসে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছ থেকে। এসব সঞ্চয় একত্র হয়ে জাতীয় সঞ্চয়ের ভিত্তি তৈরি করে। জাতীয় সঞ্চয় না বাড়লে দেশের বিনিয়োগও বাড়ে না। সরকারও উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান পায় না। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমানতকারীদের সঞ্চয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশা অনুযায়ী সঞ্চয় করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সঞ্চয় ধরে রাখতে সরকারকে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, জাতীয় সঞ্চয় মূলত সরকারি ও বেসরকারি- এ দুই খাতের সঞ্চয়ের সমন্বয়ে গঠিত। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বাজেট ঘাটতি থাকায় সরকারি খাতের সঞ্চয় প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। ফলে বেসরকারি খাতে সঞ্চয় বাড়লেও সামগ্রিক জাতীয় সঞ্চয়ের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ দেশের বিনিয়োগের অন্যতম উৎস অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বর্তমান মূল্য পরিস্থিতিতে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের অনেক মানুষকে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে আগের জমানো সঞ্চয় খরচ হচ্ছে। আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব না হওয়ায় তারা সঞ্চয় ধরে রাখতে পারছেন না। এতে নতুন করে সঞ্চয় গড়ে তোলার সুযোগও কমে যাচ্ছে।
Leave a Reply