লোড হচ্ছে...
জাতীয় বরিশাল 30 September, 2026 4 weeks আগে

পাঁচ দিনেও সন্ধান মেলেনি সুন্দরবনে অপহৃত ২১ জেলের

শেয়ার করুন: ফেসবুক টুইটার WhatsApp 13 পাঠক

সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে পাঁচ দিন ধরে নিখোঁজ ২১ জেলে। গভীর বনের কোথায় তারা আছেন, কেমন আছেন—স্বজনদের কাছে তার কোনো নিশ্চিত খবর নেই। প্রতিটি দিন যেন কাটছে উৎকণ্ঠায়। কখনও ফোন বেজে উঠলে স্বজনরা মনে করছেন, হয়তো এবার প্রিয় মানুষটির খবর মিলবে। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না।

অপহৃত জেলেদের উদ্ধারে সুন্দরবনের আকাশে ড্রোন উড়িয়ে অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। নদীপথেও চলছে চিরুনি অভিযান। তবে বুধবার রাত পর্যন্ত অপহৃত ২১ জেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এদিকে দস্যুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে জেলেদের মুক্তির চেষ্টা করছেন কয়েকজন মহাজন। মুক্তিপণ নিয়ে চলছে দর-কষাকষি।

গত শুক্র ও শনিবার (২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের নারকেলবাড়িয়া, আমড়বাড়িয়া, ভদ্রা ও ভাঙ্গা এলাকায় মাছ ধরার সময় অস্ত্রের মুখে ২১ জেলেকে অপহরণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মজনু, বড় জাহাঙ্গীর ও করিম শরীফ বাহিনীর সদস্যরা তাদের অপহরণ করে সুন্দরবনের গহীনে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় জেলেদের একটি ট্রলার, পাঁচটি মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামালও নিয়ে যায় দস্যুরা।

অপহৃত জেলেদের বাড়ি বাগেরহাট, বরগুনা ও খুলনা জেলার বিভিন্ন এলাকায়। তাদের মধ্যে ১০ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন—আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০), ফেরদাউস (২৮), ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজুর (৩৫), আলামিন (২৮), হানিফ (৩৮) ও মারুফ (৪৯)।

অপহরণের পর থেকেই এসব জেলের পরিবার, স্থানীয় জেলে ও মহাজনদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দস্যুদের ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মহাজন জানান, অপহৃত জেলেদের মুক্তির বিষয়ে তারা দস্যুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন। মুক্তিপণ হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে দাবি করা অর্থের পরিমাণ বা যোগাযোগের বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তারা।

মহাজনদের ভাষ্য, জেলেদের মুক্তির বিষয়ে দস্যুদের সঙ্গে দর-কষাকষি চলছে। দাবি করা টাকা পরিশোধ করা হলে জেলেদের ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে দস্যুরা। দ্রুত মুক্তিপণ পরিশোধের জন্যও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

পরপর দুই রাতে ২১ জেলে অপহরণের ঘটনায় সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া সাধারণ জেলেদের মধ্যেও নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই দস্যু আতঙ্কে বনে যেতে দ্বিধা করছেন।

শরণখোলা মৎস্য আড়তের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান তালুকদার বলেন, সুন্দরবনে দস্যুতা আবারও বেড়েছে। দস্যুদের উৎপাতের সময়টা আমাদের জন্য খুবই আতঙ্কের। ঠিকমতো মাছ আহরণও করা যায় না। আর যেসব জেলে অপহৃত হন, তাদের পরিবারের সদস্যরাও ভয়ে কথা বলতে পারেন না। কারণ জেলেদের মেরে ফেলারও ভয় থাকে।

তিনি বলেন, সুন্দরবনে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহাবুব হোসেন বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান চলছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোন ব্যবহার করে দস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপহৃতদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, অপহৃত জেলেদের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের উদ্ধারে কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলেদের রাতে দলবদ্ধভাবে এবং সংশ্লিষ্ট বন অফিসের আশপাশে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন বিভাগের সব স্টেশন, টহল ফাঁড়ি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বনরক্ষীদের জেলেদের নিরাপত্তায় টহল বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনে মজনু, বড় জাহাঙ্গীর, করিম শরীফসহ কয়েকটি বাহিনীর নাম শোনা যাচ্ছে। এসব বাহিনীর তৎপরতা জেলে ও সুন্দরবনের জন্য হুমকি স্বরূপ। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

চলতি বছর সুন্দরবনের বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর শতাধিক সদস্য কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন ও এসআরবি, খুলনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে । এ সময় অন্তত ৫০ জন দস্যুকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

দস্যু দমনে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বারবার কঠোর অবস্থান ও শূন্য সহিষ্ণুতা নীতির কথা জানালেও নতুন করে ২১ জেলে অপহরণের ঘটনায় উপকূলবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সুন্দরবন শুধু জীবিকার জায়গা নয়, উপকূলের হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাই জেলেদের দাবি—অপহৃত ২১ জনকে দ্রুত উদ্ধার করার পাশাপাশি সুন্দরবনে দস্যুদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করে নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এখন অপহৃত জেলেদের স্বজনদের একটাই অপেক্ষা—কবে ফিরবেন তাদের প্রিয় মানুষগুলো।

ট্যাগ:
thefourthbd

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মাল্টিমিডিয়া
দেখুন
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক
ভিডিও ১০ মি.